চিনি, ময়দা ও খোলা তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহেও টান পড়েছে। অন্যদিকে সরবরাহ বাড়ায় কিছুটা কমেছে অধিকাংশ সবজির দাম। তবে ডিম, মাছ ও মুরগির বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি।
রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে একদিকে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কিছু সবজির দাম কমায় ক্রেতারা সামান্য স্বস্তি পাচ্ছেন। গত কয়েক সপ্তাহে ময়দা ও আটার দাম বাড়ার পর চলতি সপ্তাহে চিনির পাশাপাশি খোলা ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে চিনি ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কয়েকটি দোকান ঘুরে পণ্য কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিত্যপণ্যের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চিনি-ময়দায় বাড়তি খরচ
খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। খোলা চিনির দামও বেড়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা চিনির কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ টাকা।
প্যাকেটজাত চিনির গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যও ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মিলগেট থেকেও আগের তুলনায় কম চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের এক বিক্রেতার ভাষ্য, কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ডিলাররা ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন।
দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহেও টান দেখা দিয়েছে। অনেক দোকানে চিনি না পাওয়ায় ক্রেতাদের একাধিক দোকান ঘুরে প্যাকেটজাত চিনি কিনতে হচ্ছে।
চিনির পাশাপাশি ময়দার দামও বেড়েছে। এক মাস আগে যেখানে প্রতি কেজি ময়দা ৫৮ থেকে ৬০ টাকা ছিল, পরে তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় ওঠে। শুক্রবার খুচরা বাজারে ময়দা বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮০ টাকা কেজি দরে। দুই কেজির প্যাকেটজাত ময়দার দামও ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে।
প্যাকেটজাত আটার দামও বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা প্রায় ৬০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
খোলা তেলের দাম বেড়েছে, বোতলজাত তেলে সরবরাহ কম
বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে এখনো সরকার নির্ধারিত প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০০ টাকা রয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বোতলজাত তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে আধা লিটার ও এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল খুঁজতে কয়েকটি দোকান ঘুরতে হয়েছে ক্রেতাদের। শেষ পর্যন্ত বড় দোকান থেকে তেল সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন এক ক্রেতা।
ডিম, মুরগির দাম এখনো চড়া
ডিমের বাজারেও স্বস্তি ফেরেনি। গত মাসে প্রতি ডজন ডিম ১২৫ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু দোকানে এক ডজন ডিম ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ব্রয়লার মুরগির দাম গত সপ্তাহের মতোই প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে।
পেঁয়াজের দামও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তুলনামূলক স্থির রয়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মাস আগে এর দাম ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।
আলুর দামও ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজির মধ্যে রয়েছে।
সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি
নিত্যপণ্যের সামগ্রিক বাজারে চাপ থাকলেও সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন ক্রেতারা। কয়েক সপ্তাহ আগে সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেলেও সরবরাহ বাড়ায় এখন বেশ কিছু সবজির দাম কমেছে।
খুচরা বাজারে ঢেঁড়শ, পটল, কাকরোল, ঝিঙে ও জালি কুমড়ার দাম প্রায় ৬০ টাকা কেজি। করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, লাউ ও ধুন্দল প্রায় ৮০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে বেগুন ও টমেটোর দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। বেগুনের ধরনভেদে দাম প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি।
শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি পাওয়া গেলেও দেশি শসার দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। আগাম শিমের দাম সবচেয়ে বেশি—প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সবজির দাম খুচরা বাজারের তুলনায় আরও কম। সেখানে পটল, কাকরোল ও লাউ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
কাঁচামরিচে বড় স্বস্তি
কাঁচামরিচের বাজারে আগের তুলনায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে। গত মাসে প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম প্রায় ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেলেও আমদানির সুযোগ দেওয়ার পর সরবরাহ বেড়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারে পাইকারি দাম ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
মাছের বাজারেও চড়া দাম
মাছের বাজারে এখনো দাম বেশি। তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা এবং রুই-কাতল ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাবদা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চিংড়ি আকার ও মানভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে।
দেশি কইয়ের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। চাষের কই প্রায় ৩০০ টাকা এবং চাষের শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ভোক্তার চাপ কমেনি
সবজির কিছুটা দাম কমলেও বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের স্বস্তি ফেরেনি। বিশেষ করে চাল-ডালসহ অন্যান্য মুদি পণ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিনি, আটা-ময়দা ও তেলের দাম বাড়ায় সংসারের ব্যয় আরও বাড়ছে।
এক ক্রেতার ভাষায়, বেগুন, করলা, লাউ ও কাঁচামরিচ কিনতেই উল্লেখযোগ্য অর্থ চলে যাচ্ছে। তাঁর মন্তব্য, “সবকিছুর দাম বেশি। আমাদের খাওয়ার মতো বাজার নাই।”
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে বর্তমানে দুই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে—সরবরাহ বাড়ায় কিছু সবজির দাম কমছে, কিন্তু একই সময়ে চিনি, আটা-ময়দা ও খোলা তেলের দাম বাড়ছে এবং বোতলজাত তেল ও চিনির সরবরাহে টান তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ডিম, মাছ ও মুরগির চড়া দাম অব্যাহত থাকায় সাধারণ ভোক্তার ওপর বাজারের চাপ এখনো কমেনি।

কালের দাবি ডেস্ক