ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মায়ের বিচার চাইতে গিয়ে হুমকি-হয়রানির অভিযোগ জাবি শিক্ষার্থী পূর্ণিমার।

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 1, 2026 ইং
মায়ের বিচার চাইতে গিয়ে হুমকি-হয়রানির অভিযোগ জাবি শিক্ষার্থী পূর্ণিমার। ছবির ক্যাপশন: বাম দিক থেকে আফাজ উদ্দিন, আব্দুর রহিম, ফারুক, আব্দুল খালেক, আনোয়ার।
ad728

মায়ের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে হুমকি, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার পূর্ণিমা। একই সঙ্গে তার মাকে চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখানো এবং গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ জানাতে বাধা দেওয়ারও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

পূর্ণিমা বেগম সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তার মা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই ২৪ জাগরণী হলের একজন কর্মচারী।

পূর্ণিমার অভিযোগ, ২০১৭ সালে তার মা প্রীতিলতা হলের কর্মচারী মো. আফাজ উদ্দিনের কাছ থেকে সুদে দুই লাখ টাকা ধার নেন। পরবর্তীতে মূল টাকা ও মাসিক আট হাজার টাকা সুদসহ ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট প্রায় ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে টাকা পরিশোধের পরও আফাজ উদ্দিন তার মায়ের কাছ থেকে নেওয়া একটি ব্ল্যাংক চেক ফেরত দেননি।

পূর্ণিমার দাবি, ওই চেক ব্যবহার করে পরবর্তীতে তার মায়ের বিরুদ্ধে চার লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা করা হয়। মামলার কারণে তার মাকে কারাভোগ করতে হয় এবং দুই লাখ টাকা পরিশোধ করে জামিন নিতে হয়।

এ ঘটনায় বিচার ও সহযোগিতা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি, কর্মচারী ইউনিয়ন, রেজিস্ট্রার অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছেন বলে জানান পূর্ণিমা। তার অভিযোগ, একাধিক জায়গায় যোগাযোগ করেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি।

কর্মচারী ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

পূর্ণিমা অভিযোগ করেন, তিনি ও তার মা কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা রহিম ও আনোয়ারের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলে তারা তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং কুপ্রস্তাব দেন। অভিযোগ নিয়ে তারা হাসি-ঠাট্টাও করেন বলে দাবি তার।

তার অভিযোগ, কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রহিম ও সাধারণ সম্পাদক ফারুক দীর্ঘদিন ধরে আফাজ উদ্দিনকে সুরক্ষা দিয়ে আসছেন।

একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে এসব ঘটনা প্রকাশ্যে বলতে তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল উল্লেখ করে পূর্ণিমা বলেন, অপমান, সামাজিক লজ্জা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কারণে এতদিন অনেক কথাই তিনি প্রকাশ করেননি।

সাংবাদিকদের কাছে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ 

পূর্ণিমার অভিযোগ, বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাতে চাইলে তাকে সাংবাদিকদের কাছে যেতে ও প্রেস ব্রিফিং করতে বাধা দেওয়া হয়।

তার অভিযোগ, রহিম, ফারুক ও আনোয়ারের পাশাপাশি কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকসহ আরও কয়েকজন তাকে বাধা দেন।

পূর্ণিমার দাবি, আব্দুল খালেক তাকে আফাজ উদ্দিনকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর বা হত্যার মতো বক্তব্যও দেন।

এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, একবার তিনি ও তার মা ইউনিয়ন অফিসে যাওয়ার সময় একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিলে ফারুক তার ও ওই বন্ধুর সঙ্গে উগ্র আচরণ করেন এবং বলেন, তিনি ছাত্রদের কাছে কোনো কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নন।

পূর্ণিমা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও কার্যকর সহযোগিতা না পেয়ে তিনি পূর্বপরিচিত সেলিম রেজার কাছে বিষয়টি জানান। পরে তিনি ও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী আফাজ উদ্দিনের বাসার সামনে গিয়ে তাকে কর্মচারী ইউনিয়ন অফিসে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন।

তার দাবি, আফাজ উদ্দিন তখন তাদের দিকে তেড়ে আসেন এবং মারধরসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। ওই সময় তার ছেলে সোহেলকে দিয়ে তাকে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন পূর্ণিমা।

পরবর্তীতে সেলিম রেজা বিষয়টি কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা রহিমকে জানালে রহিম আফাজ উদ্দিন সম্পর্কে ‘আফাজ ভালো লোক না’ বলে মন্তব্য করেন বলে দাবি পূর্ণিমার।

তার প্রশ্ন, যদি ইউনিয়নের নেতারা আফাজ উদ্দিন সম্পর্কে এমন ধারণা রাখেন, তাহলে তিনি ও তার মা বারবার সহযোগিতা চাওয়ার পরও তাদের পাশে দাঁড়ানো হলো না কেন?

সেলিম রেজাকে ঘিরে ভিন্ন ইস্যু তৈরির অভিযোগ 

পূর্ণিমার অভিযোগ, তার মূল অভিযোগের তদন্ত ও সমাধানের পরিবর্তে তার পাশে দাঁড়ানো সেলিম রেজাকে কেন্দ্র করে অন্য একটি ইস্যু সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, একজন অসহায় শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো বা তার অভিযোগ শোনা অপরাধ হতে পারে না। তার দাবি, মূল অভিযোগ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে ঘটনাটিকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

তবে তিনি সেলিম রেজাকে নির্দোষ বা অন্য কাউকে দোষী ঘোষণা করতে চান না জানিয়ে বলেন, মূল অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তই তার প্রধান দাবি।

আমি করুণা চাই না, বিচার চাই।

পূর্ণিমা বলেন, তিনি কারও করুণা বা বিশেষ সুবিধা চান না। তিনি চান না কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিক।

তার দাবি নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন, অভিযোগের বিচার এবং তার ও তার মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, তার অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হোক। কিন্তু অভিযোগ সত্য হলে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠী যেন কাউকে রক্ষা করতে না পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন

পূর্ণিমার প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে একজন শিক্ষার্থী ও একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কি তা তদন্ত করার দায়িত্ব নেই?

তিনি অভিযোগ যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং সত্য উদঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কি তার মায়ের জন্য ন্যায়বিচার চাইতে পারবে না? অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো কি অপরাধ? সত্য প্রকাশ করতে সাংবাদিকদের কাছে যাওয়াও কি অপরাধ?’

এটা কেমন বিশ্ববিদ্যালয়? 

পূর্ণিমা বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ন্যায়, যুক্তি, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অথচ একজন নারী শিক্ষার্থী যদি নিজের মায়ের জন্য বিচার চাইতে গিয়ে দিনের পর দিন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সমাধান না পান, হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়েন এবং সাংবাদিকদের কাছে যেতেও বাধার সম্মুখীন হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে ‘এটা কেমন বিশ্ববিদ্যালয়? এখানে একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কোথায়? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার কোথায়?’

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

পূর্ণিমা বলেন, তিনি কোনো প্রতিহিংসা চান না। তিনি চান না কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হোক।

‘আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক’ এমন মন্তব্য করে তিনি মো. আফাজ উদ্দিন, রহিম, আনোয়ার ও ফারুকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত দাবি করেন।

শেষে তিনি বলেন, ‘অন্যায় যত বড়ই হোক, ক্ষমতার ছায়া যত দীর্ঘই হোক, সত্য যেন শেষ পর্যন্ত চাপা না পড়ে। আমি ও আমার মা বিচার চাই, আমরা নিরাপত্তা চাই, আমরা সত্যের তদন্ত চাই।’



নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ভিনদেশি ফুটবলের ৯০ মিনিট ও আমাদের লাল-সবুজ আত্মোপলব্ধি

ভিনদেশি ফুটবলের ৯০ মিনিট ও আমাদের লাল-সবুজ আত্মোপলব্ধি