চট্টগ্রাম, ১৫ আগস্ট: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর।
বিষাক্ত এই গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে অধিদপ্তর। তবে এর বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শনিবার দুর্ঘটনাকবলিত শিপইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে এসব তথ্য জানান শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান।
তিনি জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসবিআর) পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শিল্প সচিব বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে ৯ সদস্যের কমিটি। পাশাপাশি বিএসবিআরের পক্ষ থেকেও পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে কমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান শিল্প সচিব।
দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিরাপদে অপসারণ করা হবে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানান শিল্প সচিব।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরীক্ষার বরাত দিয়ে আব্দুন নাসের খান বলেন, জাহাজটিতে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঘটনার মূল কারণ হিসেবে হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততাকে ধারণা করা হচ্ছে। সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাহাজ থেকে এই গ্যাস অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত হয়। তাই সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণ করা হবে।
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুরোনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় বদ্ধ অংশে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে শ্রমিকরা আক্রান্ত হন।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের ভেতরে থাকা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে গেলে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন।
পরে একে একে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। অন্য নিহতরা হলেন—সানি দাস, পলাশ দাস, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন এবং ১৭ বছর বয়সী মতিউর রহমান সাজ্জাদ।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া, পুলিশ সুপার মাসুদ আলম, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের দাবি ডেস্ক