চট্টগ্রামে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যেই বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা, অন্যদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার—দুই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ জন ডেঙ্গু রোগীও শনাক্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করছে, আশপাশের জেলা থেকে রোগী আসার কারণে হামের প্রকৃত সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহর হওয়ায় কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং পার্বত্য তিন জেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে উপজেলার তুলনায় নগর এলাকায় সংক্রমণ এখনও বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে চলতি বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩ হাজার ৮৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬০৪ জন। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৮১ এবং এপ্রিল মাসে ৭২৩ জন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেই সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন জানিয়েছেন, বর্তমানে হাম ওয়ার্ডে ১১২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আক্রান্তদের যথাযথ আইসোলেশনে না থাকা। ডা. তসলিম উদ্দিন বলেন, অনেক রোগী জটিল অবস্থা হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন এবং বাড়িতে পর্যাপ্ত বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করছেন না। কোভিড-১৯-এর সময়ের মতো আইসোলেশন প্রটোকল মেনে চললে সংক্রমণ আরও কমানো সম্ভব হতো।
টিকা গ্রহণের পরও কেন আক্রান্ত হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, টিকাদান কার্যক্রম শুরুর আগেই অনেকের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া একটি বড় প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত পরীক্ষায় ৩৩১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৭৬ জনই নগর এলাকার বাসিন্দা। হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়তে শুরু করেছে। জুন মাসে চট্টগ্রামে ১২২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেই নতুন করে আরও ১৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৯ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর ২৭ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে। এ কারণে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা 'রেড জোন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার একটি পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
কালের দাবি ডেস্ক