ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কাঁটাতার ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন ছিন্ন করতে পারেনি: বাংলাভাগ দিবসের আলোচনায় বক্তারা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 14, 2026 ইং
কাঁটাতার ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন ছিন্ন করতে পারেনি: বাংলাভাগ দিবসের আলোচনায় বক্তারা ছবির ক্যাপশন: রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ‘বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ফিরে দেখা বাংলাভাগ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা।
ad728


১৯৪৭ সালের বাংলাভাগ কেবল মানচিত্রের বিভাজন বা নতুন ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া সেই বিভাজনের ক্ষত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ।

বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ‘বাংলাভাগ দিবস পালন পরিষদ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ফিরে দেখা বাংলাভাগ’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে লেখক ও সাংবাদিক মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, দেশভাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অভিজাত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কিন্তু এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ও নারীদের।

জীবনানন্দ দাশ ও কবি আবুল হাসানের সাহিত্যকর্মের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জমিনের ওপর কাঁটাতার বসানো সম্ভব হলেও দুই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অভিন্ন আত্মিক সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।

তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ধারাবাহিকতায় যে সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ট্রমার জন্ম হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো সমাজে বিদ্যমান। এ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় নিজের পারিবারিক স্মৃতি ও দেশভাগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ব্রিটিশদের বিভাজননীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবিমৃশ্যকারিতার কারণে লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

তিনি বলেন, দেশভাগের এই গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি তৎকালীন চিত্রকলায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ধর্মীয় বিভাজন ভুলে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ শাহ্ সূফী হাসান শাহ্ সুরেশ্বরী দিপুনুরী বলেন, ধর্ম মানুষের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না; মানুষের প্রধান পরিচয় তার মানবতা। আধ্যাত্মিক চেতনা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে না, বরং পারস্পরিক দূরত্ব ও সীমারেখা অতিক্রম করার শিক্ষা দেয়।

তিনি বলেন, ধর্মের রাজনৈতিকীকরণের মাধ্যমে যে কৃত্রিম বিভাজন ও বিদ্বেষের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে, পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও উদার মানবিক চেতনার মধ্য দিয়েই তা দূর করা সম্ভব।

নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষক অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের একটি প্রকল্প ছিল। এই বিভাজন সাধারণ মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নামে সমাজকে ধর্ম ও পরিচয়ের ভিত্তিতে এককেন্দ্রিক করার প্রবণতা নাগরিকদের আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলছে। এই সংকীর্ণ রাজনৈতিক দর্শনের বিকল্প দার্শনিক ও মানবিক বোঝাপড়া তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

আয়োজকদের পক্ষে মোহাম্মদ আল মুন্তাজির বলেন, হাজার বছরের অভিন্ন ইতিহাস থাকার পরও ১৯৪৭ সালে কেন বাংলাকে বিভক্ত হতে হয়েছিল, সেই ইতিহাস ও মানবিক ক্ষতের নির্মোহ মূল্যায়ন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জরুরি।

আলোচনা সভায় বক্তারা একমত পোষণ করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় সীমানা পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত হলেও ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক অনুভূতির জায়গায় দুই বাংলার মানুষের সম্পর্ক আজও অটুট।

তারা বলেন, রাজনৈতিকভাবে দুই বাংলা বিভক্ত হলেও এই বন্ধনের যতটুকু ছিন্ন হয়েছে, তার ক্ষত ও রক্তক্ষরণ আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুভূত হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।



নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঘোষণা, কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঘোষণা, কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?