ঢাকা | বঙ্গাব্দ

দারিদ্র্য থেকে উদ্যোক্তা: কৃষকের জীবন সহজ করছেন রাজবাড়ীর হোসেন আলী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 15, 2026 ইং
দারিদ্র্য থেকে উদ্যোক্তা: কৃষকের জীবন সহজ করছেন রাজবাড়ীর হোসেন আলী ছবির ক্যাপশন: ছবি: বাসস
ad728

দারিদ্র্য, অভাব আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা হোসেন আলীর জীবন। সংসারের চাপে অষ্টম শ্রেণিতেই পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছিল। কিন্তু জীবনযুদ্ধের সেই কঠিন পথই তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য সাফল্যের গল্পে। আজ তিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং কৃষকদের জন্য সময়োপযোগী কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন।

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের স্বর্ণলতা গ্রামের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম হোসেন আলীর। বাবা আমীর আলী ও মা রাবেয়া বেগমের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। অভাবের কারণে কৈশোরেই জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়। পাংশা শহরের একটি ওয়ার্কশপে কুষ্টিয়ার অভিজ্ঞ মিস্ত্রি জামাত আলীর কাছে কাজ শেখার সুযোগ পান। শুরুতে পারিশ্রমিক বলতে ছিল শুধু খাবারের ব্যবস্থা।

ওয়ার্কশপে কাজ করতে করতেই কৃষিযন্ত্রের নকশা, ব্যবহার ও মেরামতের নানা কৌশল আয়ত্ত করেন তিনি। পরে ওস্তাদের মৃত্যুর পর পুরো ওয়ার্কশপের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগায়।

পরবর্তীতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় গাজীপুরের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত 'সিমিট বাংলাদেশ' কর্মসূচি থেকেও আধুনিক কৃষিযন্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এসব প্রশিক্ষণ তার উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও বিকশিত করে।

পাংশা অঞ্চলে পেঁয়াজ উৎপাদন বেশি হলেও সংরক্ষণ সংকটের কারণে কৃষকদের কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। এই সমস্যার সমাধানে হোসেন আলী তৈরি করেন স্থানীয় উপযোগী এয়ার ফ্লো পেঁয়াজ সংরক্ষণ মেশিন, যেখানে একসঙ্গে ২০০ থেকে ৩০০ মণ পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। এরপর তিনি উদ্ভাবন করেন পেঁয়াজ গ্রেডিং মেশিন, যা অল্প সময়েই ছোট ও বড় পেঁয়াজ আলাদা করতে সক্ষম।

পাংশার বাগদুলি গ্রামের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সোহান আলী বলেন, এই মেশিন ব্যবহারের ফলে পেঁয়াজ বাছাইয়ের কাজ অনেক সহজ হয়েছে এবং সময়ও কম লাগছে।

এতেই থেমে থাকেননি হোসেন আলী। তিনি ঘাস কাটার মেশিনের পাশাপাশি এমন একটি কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন তৈরি করেছেন, যা কৃষকদের শ্রম ও সময় দুটিই কমিয়ে দিচ্ছে।

হোসেন আলীর ভাষ্য, তার উদ্ভাবিত মেশিনটি এক ঘণ্টায় প্রায় ১০০ আঁটি কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়াতে পারে। এতে শ্রমিকের প্রয়োজন অনেক কমে যায় এবং অল্প সময়েই উন্নতমানের সোনালি আঁশ পাওয়া সম্ভব হয়।

চাঁদপুরের বাণিজ্যিক পাটচাষি কাউসার আহমেদ বলেন, বর্তমানে শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরির কারণে পাটের আঁশ ছাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই হোসেন আলীর তৈরি মেশিনটি তার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

বর্তমানে হোসেন আলীর ওয়ার্কশপে পাঁচজন কর্মী কাজ করছেন। কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের পরও প্রতি মাসে তার আয় থাকে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। রাজবাড়ীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা তার তৈরি যন্ত্র কিনতে আসছেন।

জীবনের শুরু দিনের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হোসেন আলী বলেন, "একসময় পেটের ভাতের জন্য কাজ করেছি। আজ আমার তৈরি মেশিন কৃষকের কাজে লাগছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক কৃষিযন্ত্র তৈরি করে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে চাই।"

পাংশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, হোসেন আলীর উদ্ভাবনী দক্ষতা দেখে তাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। তার নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা তাকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সম্প্রতি পাংশা কৃষি মেলায় তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দেখে জেলা প্রশাসকও তাকে উৎসাহ দিয়েছেন।

সংগ্রাম থেকে উঠে এসে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকের জীবন সহজ করার যে দৃষ্টান্ত হোসেন আলী গড়েছেন, তা দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
১২ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা

১২ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা