বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানের ঘোষিত বৃত্তি কর্মসূচির সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘নলেজ করিডর’ উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হলেও নতুন করে নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তাঁদের অফার লেটারে ঘোষিত সুবিধার তুলনায় অনেক কম সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় সফর করেন। দীর্ঘদিনের স্থবির বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জনগণের যোগাযোগ বাড়াতে ‘নলেজ করিডর’ নামে একটি শিক্ষা সহযোগিতা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। ব্যাচেলরস, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এ সুযোগ রাখার কথা বলা হয়।
বৃত্তিটিকে ‘পূর্ণাঙ্গ’ হিসেবে প্রচার করার সময় টিউশন ফি, মাসিক মেইনটেন্যান্স অ্যালাউন্স, হোস্টেল খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স এবং রিটার্ন এয়ার টিকিটের মতো সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে এটি বিদেশে পড়াশোনার অধিকাংশ ব্যয় বহনকারী একটি বৃত্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
নলেজ করিডরের প্রথম ব্যাচে প্রায় ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে যান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
এরপর চলতি বছরের মে মাসে ঢাকায় ‘পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপো’র মাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়।
অনেক শিক্ষার্থী আগের ঘোষণার ভিত্তিতে এবারও বৃত্তিটিকে পূর্ণ অর্থায়িত বলে ধরে নিয়ে আবেদন করেন। কিন্তু মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অফার লেটার পাওয়ার পর সুবিধার ধরনে পার্থক্য দেখতে পান বলে অভিযোগ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অফার লেটারে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন সুবিধা থাকলেও মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা নেই। খাবারের খরচ, যাতায়াত ব্যয় কিংবা বিমান ভাড়ার সুবিধাও উল্লেখ করা হয়নি।
কিছু শিক্ষার্থীর দাবি, ভিসা ফি, স্বাস্থ্যবীমা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও তাঁদের নিজেদের বহন করতে হবে। ফলে শুরুতে ‘ফুললি ফান্ডেড’ হিসেবে যে বৃত্তির কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেটির আওতা কতটা—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও আনুষ্ঠানিক প্রচারে বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর মতে, মাস্টার্স পর্যায়ে যদি পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ না থাকে, তাহলে আবেদন গ্রহণের সময়ই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, তাঁর পাওয়া অফার লেটারে টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বীমা ও অন্যান্য খরচ বাদ রাখা হয়েছে।
বিষয়টি শুধু বৃত্তির অর্থমূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি থাকা, খাবার, যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয়ও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের অর্থে এসব খরচ বহন করতে পারেন না, তাঁদের জন্য ঘোষিত বৃত্তির ধরন ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে পার্থক্য বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মূলত দুটি বিষয়ে স্পষ্টতা চাওয়া হচ্ছে—প্রথমত, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুরুতে ‘পূর্ণাঙ্গ’ বা ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তি বলতে ঠিক কোন কোন সুবিধা বোঝাতে চেয়েছিল; দ্বিতীয়ত, বর্তমান অফার লেটারে সেই সুবিধাগুলোর সবগুলো কেন নেই।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের কমস্যাটস বিশ্ববিদ্যালয় (COMSATS University Islamabad) ওআইসি সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি প্রোগ্রামে বিনা টিউশন ফিতে পড়াশোনার সুযোগের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও আবেদন করার সুযোগ পান।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস বিষয়ে মাস্টার্স অব সায়েন্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে মোট ২৫টি বৃত্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। ওই কর্মসূচির আবেদনের শেষ সময় ছিল ৩১ মে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের বৃত্তি কর্মসূচিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও ঘোষিত সুবিধা ও বাস্তব অফার লেটারের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালের দাবি ডেস্ক