ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার তাণ্ডব: আইনশৃঙ্খলা কোথায় এবং কার আশ্রয়ে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 28, 2026 ইং
রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার তাণ্ডব: আইনশৃঙ্খলা কোথায় এবং কার আশ্রয়ে? ছবির ক্যাপশন: মিরপুর ১ নম্বরে গুঁড়িয়ে দেওয়া ৫০ বছরের পুরোনো রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ফাইল ছবি।
ad728

রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি’ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে আজ যেকোনো সচেতন নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য আমরা কি সত্যিই কোনো আইনি কাঠামোর ভেতর বাস করছি, নাকি দেশে জোর যার মুলুক তার নীতিই চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে? গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারী এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসে যেভাবে অর্ধশতকের পুরোনো একটি দাতব্য চিকিৎসালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, তা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়। এটি রাজপথ ও অলিগলিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের বেপরোয়া মনোভাবের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৪ সাল থেকে যে প্রতিষ্ঠানটি বস্তিবাসী, সুবিধাবঞ্চিত এবং নিম্নআয়ের মা ও শিশুদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে, যা সংলগ্ন এলাকার প্রায় তিন প্রজন্মের প্রথম টিকা নেওয়া কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার স্মৃতি বহন করে, তাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো। অথচ পুরো প্রক্রিয়াকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা দেখা গেল কেবলই নীরব দর্শকের মতো।

এই নৃশংস তাণ্ডবের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর আদাবরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে ঢুকে তাণ্ডব ও ভাঙচুরের খবর আমাদের সামনে আসে। সেখানেও বিরোধের অজুহাতে ক্যাডারদের পাঠিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো নাগরিকের সম্পত্তি নিয়ে যদি বিরোধ থেকেও থাকে, তবে কোন বিধানে বা কার সুবাদে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মধ্যরাতে গিয়ে সেখানে এক্সক্যাভেটর চালিয়ে দিতে পারে? পুলিশ কিংবা প্রশাসন তখন কোথায় থাকে? ঘটনা ঘটার পর ওসির সাময়িক প্রত্যাহার বা কয়েকজন ভাসমান দিনমজুরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দায় সারার পুরানো অভ্যাস আমরা বহু দেখেছি। কিন্তু যে গডফাদারদের রাজনৈতিক ইন্ধনে, ক্ষমতার দাপটে এবং টাকার জোরে এই বুলডোজার পরিচালিত হলো, তারা কেন এখনো অধরা?

ঘটনার পেছনের অনুঘটকগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ক্ষোভের বিস্ফোরণ নয়। এটি ভূমিদস্যু, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়পুষ্ট একশ্রেণির সুবিধাবাদীর পরিকল্পিত দখলদারির চক্রান্ত। যখন কোনো স্থানে জমির দাম আকাশচুম্বী হয়, তখন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোই এই চক্রগুলোর প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রাড্ডার মতো প্রতিষ্ঠান যা সুইডিশ ‘রাড্ডা বার্নেন’ বা সেভ দ্য চিলড্রেনের হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছিল, তা ৫০ বছর ধরে সাধারণ মানুষের সেবা দিয়ে আসছিল। একে নিশানা করার পেছনে স্পষ্টত আর্থিক লোভ ও ক্ষমতার দাপট কাজ করেছে। অপরাধীরা ভালো করেই জানে যে, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং পুলিশি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিলে পার পাওয়া কঠিন নয়।

এখানে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের বড় প্রভাব রয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে, ওই এলাকার হাজার হাজার অসচ্ছল পরিবার ও তাদের শিশুরা তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে কর্মীরা যে কোনোমতে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন, তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটি আরও মারাত্মক। যখন কোনো রাষ্ট্রে এমন দৃশ্য দৃশ্যমান হয় যে, তিন ঘণ্টা ধরে এক্সক্যাভেটর চালিয়ে একটি ভবন ভাঙা হচ্ছে আর পুলিশ তা ফেরাতে অপারগ বা অনিচ্ছুক তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও আইনের ওপর থেকে শেষ বিশ্বাসটুকুও উঠে যায়। অপরাধীরা এতে বার্তা পায় যে, সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে আর্থিক বা রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটাতে পারলে যেকোনো অপরাধই ঢাকা দেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা রক্ষা করা এখন অন্যতম প্রধান জাতীয় স্বার্থে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আইনের শাসন। যদি রাজধানীর বুকেই দাতব্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ না থাকে, তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা কোথায়? এই ধরনের নৈরাজ্য দেশের পরিবেশকে অস্থির করে তোলে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন সাধারণ নাগরিক তার জীবিকা ও মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে শঙ্কিত থাকলে কোনো উন্নয়ন নীতিই টেকসই হতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হলো, করণীয় কী? কেবল দু-চারজন টোকাই বা ভাসমান মানুষকে নগদ টাকার বিনিময়ে ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার অপরাধে ধরে চালান করে দিলেই বিচার নিশ্চিত হয় না। রাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসনকে এখন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে:

প্রথমত, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন বা বিশেষ টিম গঠনের মাধ্যমে এই দখলদারির নেপথ্যে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যার নামই উঠে আসুক না কেন তাকে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধীকে ‘অপরাধী’ হিসেবেই দেখতে হবে, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক সদস্য ঘটনার সময় তিন ঘণ্টা ধরে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাঁদের কেবল ‘প্রত্যাহার’ বা বদলি করে পার না দিয়ে দায়িত্বে চরম অবহেলার জন্য বিভাগীয় ও আইনি শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। অপরাধের পেছনে প্রত্যক্ষ সহায়তার প্রমাণ মিললে তাঁদেরও অপরাধের সহযোগী হিসেবে গণ্য করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারি খরচে বা উদ্ধারকৃত মালামাল ও অপরাধীদের জরিমানা আদায় করে অনতিবিলম্বে ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি’ কেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণ করে দিতে হবে, যাতে করে দুস্থ মা ও শিশুরা তাঁদের আগের জায়গায় সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারেন। একই সঙ্গে এই জায়গাটিকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে চিরতরে ভূমিলোভীদের হাত থেকে মুক্ত রাখার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিতে হবে।

অবশেষে এটিই সত্য যে, ইট পাথরের দেয়াল ভাঙা সহজ, কিন্তু ভেঙে পড়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ভেঙে যাওয়া জনআস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। মিরপুরের রাড্ডায় এক্সক্যাভেটর চালানো শুধু একটি ভবনের ওপর হামলা নয়; এটি আমাদের পুরো আইনি কাঠামোর মুখে এক চড়। বিচারহীনতার এই কুৎসিত সংস্কৃতি যদি এখনই উপড়ে ফেলা না যায়, তবে আজ রাড্ডা, কাল অন্য কোনো বিদ্যালয়, পরশু আপনার কিংবা আমার ঘরবাড়িও একইভাবে বুলডোজারের নিচে পিষে যাবে। রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে এই জঙ্গলতন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেবে, নাকি অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

দিপংকর চন্দ্র কর

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, কালের দাবি



নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়

এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়