ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির দ্বার থেকে ঘুরে দাঁড়ানো পান্ডা কেন চীনেই সীমাবদ্ধ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 16, 2026 ইং
বিলুপ্তির দ্বার থেকে ঘুরে দাঁড়ানো পান্ডা কেন চীনেই সীমাবদ্ধ ছবির ক্যাপশন: চীনের পাহাড়ি বাঁশবনেই প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করে জায়ান্ট পান্ডা। ফাইল ছবি
ad728

বিশাল পৃথিবীতে অসংখ্য পাহাড়, বন ও সংরক্ষিত এলাকা থাকলেও বন্য জায়ান্ট পান্ডার প্রাকৃতিক আবাস এখন শুধু চীন। কালো-সাদা লোমের এই প্রাণীটি চীনের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

কিন্তু সব পান্ডা শুধু চীনেই থাকে—বিষয়টি এমন নয়। জায়ান্ট পান্ডা প্রাকৃতিকভাবে শুধু চীনে পাওয়া গেলেও রেড পান্ডার বিচরণ চীন ছাড়াও নেপাল, ভারত, ভুটান ও মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত।

জায়ান্ট পান্ডার এই স্বাতন্ত্র্যই তাকে চীনের অন্যতম পরিচিত প্রতীকে পরিণত করেছে।


জায়ান্ট পান্ডা ভালুক পরিবারের সদস্য। পূর্ণবয়স্ক একটি পান্ডার দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মিটার এবং কাঁধ পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার হতে পারে। ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। সাধারণত পুরুষ পান্ডা স্ত্রী পান্ডার চেয়ে কিছুটা বড় ও ভারী।

তাদের শরীরের বড় অংশ সাদা হলেও চোখের চারপাশ, কান, নাকের অংশ, পা ও কাঁধে কালো লোম রয়েছে। ঘন ও উলের মতো লোম ঠান্ডা পাহাড়ি পরিবেশে শরীর উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

তবে পান্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাদের খাদ্যাভ্যাস।


বিবর্তনের দিক থেকে পান্ডার পরিপাকতন্ত্র মাংসাশী প্রাণীর মতো হলেও তারা প্রায় পুরোপুরি তৃণভোজী হয়ে উঠেছে। তাদের খাদ্যের প্রধান অংশ বাঁশ।

একটি জায়ান্ট পান্ডাকে দিনে প্রায় ১২ থেকে ৩৮ কেজি বাঁশ খেতে হয়। বাঁশে পুষ্টির পরিমাণ কম এবং এর বড় অংশই হজম হয় না। তাই একটি পান্ডা দিনের প্রায় ১২ ঘণ্টা খাবার খাওয়ার পেছনে ব্যয় করে।

এমনকি দিনে প্রায় ৫০ বার পর্যন্ত মলত্যাগ করতে পারে তারা।

পান্ডা অবশ্য শুধু বাঁশ খায় না। খাদ্যের প্রায় এক শতাংশে অন্য উদ্ভিদ এবং কখনো কখনো ছোট প্রাণীও থাকে।

বাঁশ আঁকড়ে ধরে খাওয়ার জন্য পান্ডার কবজির একটি বিশেষ হাড় আঙুলের মতো কাজ করে। তাদের চওড়া ও শক্ত দাঁতও বাঁশ কাটতে সাহায্য করে।


এই বাঁশনির্ভরতাই পান্ডার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।

কারণ বাঁশবন নষ্ট হলে পান্ডার খাবারের উৎসও নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের বসতি, কৃষিকাজ ও বনভূমি ধ্বংসের ফলে শত শত বছর ধরে পান্ডার আবাসস্থল ছোট হতে হতে শেষ পর্যন্ত চীনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

একসময় জায়ান্ট পান্ডার বিচরণক্ষেত্র দক্ষিণ ও পূর্ব চীন ছাড়িয়ে মিয়ানমার ও উত্তর ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডে সেই বিস্তৃত আবাসস্থল হারিয়ে যায়।

বর্তমানে চীনের সিচুয়ান, শানশি ও গানসু প্রদেশের ছয়টি পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ২০টি বিচ্ছিন্ন বাঁশবনে বন্য জায়ান্ট পান্ডা বাস করে। তাদের বড় অংশ মিনশান ও চিনলিং পর্বতমালায় রয়েছে।


পান্ডার জন্য চীনের ওই পাহাড়ি অঞ্চলগুলো উপযোগী হওয়ার আরেকটি কারণ হলো জলবায়ু ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য।

পান্ডা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না। উঁচু পাহাড়, কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকা এবং তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা পরিবেশ তাদের জন্য উপযুক্ত।

এ ছাড়া চীনে বাঁশের প্রজাতি ও বৈচিত্র্যও অত্যন্ত বেশি। ফলে পান্ডার প্রধান খাবারের পর্যাপ্ত উৎস সেখানে পাওয়া যায়।

অর্থাৎ পান্ডার বর্তমান আবাসস্থল গড়ে ওঠার পেছনে একদিকে রয়েছে দীর্ঘ পরিবেশগত ইতিহাস, অন্যদিকে রয়েছে তাদের বিশেষ খাদ্য ও জলবায়ুর প্রয়োজন।


বনে পান্ডার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করাও সহজ নয়। গবেষকদের দুর্গম পাহাড়ি বাঁশবনে দিনের পর দিন অনুসন্ধান চালাতে হয়।

পান্ডার উপস্থিতি শনাক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো তাদের মল পরীক্ষা করা। মল থেকে হজম না হওয়া বাঁশের অংশ আলাদা করে দাঁতের কামড়ের চিহ্ন বিশ্লেষণ করা হয়। কারণ প্রতিটি পান্ডার কামড়ের ছাপ আলাদা।

ডব্লিউডব্লিউএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের সর্বশেষ জরিপে চীনের বনে ১ হাজার ৮৬৪টি জায়ান্ট পান্ডা পাওয়া গিয়েছিল।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে এই সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও কম। ফলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে পান্ডার সংখ্যা বাড়াকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।


পান্ডার আবাসস্থল রক্ষায় চীন বড় ধরনের সংরক্ষণ কর্মসূচি নিয়েছে।

দেশটিতে ৬৭টি পান্ডা সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব এলাকায় বন্য পান্ডার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নিরাপদে বাস করছে। বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে বাঁশ করিডোরও তৈরি করা হয়েছে।

এসব করিডোর পান্ডাদের এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়ার সুযোগ দেয়। এতে খাবারের সন্ধান, নতুন এলাকায় বিস্তার এবং সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

বনের বাইরে চিড়িয়াখানা ও প্রজনন কেন্দ্রে আরও প্রায় ৬০০ জায়ান্ট পান্ডা রয়েছে। এদের বড় অংশ চীনে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে থাকা পান্ডাগুলোও চীনের কাছ থেকে ধার নেওয়া।


পান্ডার বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে তাদের অতীতের বিপদের কথাও জানা দরকার।

১৮৬৯ সালের মার্চে ফরাসি ধর্মযাজক ও প্রকৃতিবিদ আর্মান্ড ডেভিডের হাতে একটি পান্ডার চামড়া পৌঁছানোর পর পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক মহলে প্রাণীটি পরিচিতি পেতে শুরু করে।

বিশ শতকের শুরুতে পশ্চিমা শিকারি ও সংগ্রাহকদের আগ্রহ আরও বাড়ে। ১৯২৯ সালে রুজভেল্ট পরিবারের দুই ভাই প্রথম বিদেশি হিসেবে একটি পান্ডা শিকার করেন।

এরপর ১৯৩৬ সালে আমেরিকান অভিযাত্রী রুথ হারকেস একটি জীবিত শিশু পান্ডাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেলে পশ্চিমা বিশ্বে পান্ডাকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

পান্ডার গোল মুখ, বড় চোখ, কালো-সাদা শরীর ও শান্ত স্বভাব মানুষের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা তৈরি করে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তথাকথিত ‘পান্ডা কাল্ট’।


পান্ডার জনপ্রিয়তা বাড়লেও তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমি তখন দ্রুত কমছিল।

১৯৪৬ সালে চীন বিদেশিদের পান্ডা নিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে ষাটের দশকের শুরুতে পান্ডার জন্য সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা ও শিকার নিষিদ্ধ করা হয়।

সত্তরের দশকের জরিপে পান্ডার সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার তথ্য সামনে আসে। বিশেষ করে সিচুয়ান প্রদেশে তাদের উপযুক্ত বনাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি হারিয়ে গিয়েছিল।

এরপর পান্ডার আবাসস্থল সংরক্ষণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নব্বইয়ের দশকে তাদের আবাসস্থলের বড় অংশ সংরক্ষিত এলাকার আওতায় আনা হয়।

এর ফলেই ধীরে ধীরে পান্ডার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালের জরিপে বন্য পান্ডার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৪-তে।


পান্ডার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শুধু সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণীটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

১৯৫৭ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চীন বিভিন্ন দেশকে কূটনৈতিক সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ২৪টি পান্ডা উপহার দিয়েছিল। এই নীতিই পরে ‘পান্ডা ডিপ্লোম্যাসি’ নামে পরিচিত হয়।

ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে উত্তেজনার সময়ও চীন পান্ডাকে কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সত্তরের দশকে যুক্তরাজ্যকেও পান্ডা দেওয়া হয়।

তবে আশির দশকে নীতিতে পরিবর্তন আসে। চীন জায়ান্ট পান্ডাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে এবং উপহার দেওয়ার বদলে ধার দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে।


বর্তমানে বিদেশে থাকা জায়ান্ট পান্ডাগুলোর মালিকানাও চীনের কাছেই থাকে। এমনকি বিদেশে জন্ম নেওয়া পান্ডার শাবকও আইনগতভাবে চীনের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাধারণত পান্ডা ধার দেওয়ার চুক্তির মেয়াদ ১০ বছর। প্রতি জোড়া পান্ডার জন্য বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশকে।

এ ছাড়া পান্ডার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, খাবার সরবরাহ, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচও অনেক বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে থাকা কিছু পান্ডাকে আবার চীনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাপানের উয়েনো চিড়িয়াখানায় থাকা শাও শাও ও লেই লেইকেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।


পান্ডার ইতিহাস তাই শুধু একটি প্রাণীর টিকে থাকার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশের পরিবর্তন, মানুষের কর্মকাণ্ড, সংরক্ষণ বিজ্ঞান এবং চীনের রাষ্ট্রীয় নীতি।

একসময় বিস্তৃত অঞ্চলে বিচরণ করা জায়ান্ট পান্ডা মানুষের কারণে আবাসস্থল হারিয়ে চীনের দুর্গম পাহাড়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে সংরক্ষিত বন, শিকার নিষিদ্ধকরণ, বাঁশবন রক্ষা এবং বিচ্ছিন্ন আবাসস্থলের মধ্যে করিডোর তৈরির মতো পদক্ষেপ তাদের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

আজ বন্য জায়ান্ট পান্ডার স্বাভাবিক আবাস চীনেই সীমাবদ্ধ। আর বিদেশের চিড়িয়াখানায় দেখা পান্ডাগুলোও মূলত চীনের মালিকানাধীন ধার দেওয়া প্রাণী। ফলে পান্ডা কেন শুধু চীনের—এর উত্তর একক কোনো কারণে নয়; প্রকৃতি, খাদ্য, জলবায়ু, ইতিহাস এবং কয়েক দশকের সংরক্ষণনীতির সম্মিলিত ফলেই আজ পান্ডার একমাত্র প্রাকৃতিক ঠিকানা চীন।


সূত্র:বিবিসি


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কালের দাবি ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
হিমালয়ের বন্যার পানি গঙ্গায়, ফারাক্কা–তিস্তার দিকে নজর বাংলা

হিমালয়ের বন্যার পানি গঙ্গায়, ফারাক্কা–তিস্তার দিকে নজর বাংলা