বাংলাদেশের চারুশিল্প, নাট্যনির্দেশনা, পাপেট শিল্প ও টেলিভিশন জগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হবে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে তার নিজ বাসভবনে রাখা হবে, যেখানে শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহীরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। জানাজা ও দাফনের সময় ও স্থান পরে পরিবার জানাবে।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। প্রোস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসা চলছিল তার। সর্বশেষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কয়েকদিন উন্নতির পর ভেন্টিলেটর খুলে দেওয়া হলেও পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবার ভেন্টিলেটর সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখানেই জীবনের ইতি ঘটে তার।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ছাত্রজীবনেই ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কার্টুন আঁকার কারণে কারাবরণ করেছিলেন। পরে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
১৯৬০ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় এসে চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যোগ দিয়ে দেশের সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। বিটিভির জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’, ‘মনের কথা’, নাটক ‘রক্তকরবী’ এবং ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ তার সৃজনশীল পরিচালনার উজ্জ্বল নিদর্শন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও দেশাত্মবোধক গান প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে প্রচার না করার সাহসী সিদ্ধান্তেও তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। তার সৃষ্টি ‘পারুল’ চরিত্র পরবর্তীতে ইউনিসেফের বিখ্যাত ‘মীনা’ চরিত্র সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। টেলিভিশনের জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’-ও তারই সৃষ্টি।
দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ নির্মাণ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপ নির্মাণেও ছিল তার অসামান্য অবদান।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও টিভি নাটক, চারুশিল্প, শিশু সংস্কৃতি ও পাপেট শিল্পে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শিল্প, সংস্কৃতি ও শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কালের দাবি ডেস্ক