রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকার।
শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যেসব রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন এবং যাদের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে এসে মিয়ানমারের এই ঘোষণা এলো। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে আগে থেকেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিল।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা ও সহিংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ ওঠে।
মিয়ানমার সরকার অবশ্য রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশের স্বীকৃত ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকার করে না। দেশটির কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা গত জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলেও দেশটির সরকার দাবি করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর যাচাই করা রোহিঙ্গা বাসিন্দাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে মিয়ানমার।
তবে মিয়ানমার সরকার রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল এবং ২ লাখের বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে থেকে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৮ সালে দুই বছর মেয়াদি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই উদ্যোগ কার্যত থেমে যায়। এরপর দেশটিতে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়।
২০২৩ সালে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এতে ওই অঞ্চলে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর পরিস্থিতির অবনতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের যাত্রায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার প্রত্যাবাসন উদ্যোগের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে।
তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছিলেন, ওই কর্মসূচি কেবল মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ফলে মিয়ানমারের সর্বশেষ ঘোষণায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হলেও ,রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো অনিশ্চিত!!

কালের দাবি ডেস্ক