রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা:
মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।
২. সহিংসতা বন্ধ করা:
রাখাইন রাজ্যসহ রোহিঙ্গাদের বসবাসের এলাকায় চলমান সহিংসতা বন্ধ করে প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৩. মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা:
রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।
৪. ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা:
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানো:
মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসনসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো নতুন করে মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি।
শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে একটি নতুন প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গা শিশু, তরুণ ও প্রবীণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা শিবিরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
প্রধানমন্ত্রী জানান, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে গিয়ে পুনঃএকীভূত হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো বসবাসের জন্য আদর্শ স্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ
দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসনসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
কমছে মানবিক সহায়তা
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য সেই প্রয়োজন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, এই অর্থ দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সহায়তার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না উল্লেখ করে তিনি রোহিঙ্গা সংকটে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য শুধু বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহনের প্রত্যাশাও করা যায় না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ফলে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে জানান তিনি।
সহমর্মিতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে শুধু সহমর্মিতা প্রকাশ না করে এর মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এখন প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়।

কালের দাবি ডেস্ক