
আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা।
পূজার আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, সকালে দর্পণ-বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানানোর পর সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর তাৎপর্য শুধু দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো নয়; মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াও এর অন্যতম শিক্ষা। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠাই এ আয়োজনের মূল তাৎপর্য।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। পরবর্তী পাঁচ দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পূজা-অর্চনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা। দশমী তিথিতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যান। আগামী শরতে তিনি আবার ধরণীতে ফিরে আসবেন—এমন প্রত্যাশা নিয়ে তাঁকে বিদায় জানান ভক্তরা।
বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পলাশীর মোড়ে জড়ো হন।
পরে শত শত ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, গোলাপ শাহ মাজার ও কোর্ট এলাকা ঘুরে সদরঘাটে পৌঁছায়। এ সময় সড়কের দুই পাশে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।
শোভাযাত্রা ঘিরে সড়ক ও আশপাশের ভবনগুলোতে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। পরে ঢাকের বাদ্য ও বিদায়ের আবহে একে একে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে তুরাগ নদীতেও চলে বিসর্জন।
বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সড়কে পুলিশ, নদীতে নৌপুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের দলও নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত ছিল।
দেশের অধিকাংশ পূজামণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমা রেখে দেওয়া হয়। সেখানে পূজায় ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।
প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তিজল সংগ্রহ করে মঙ্গলঘটে রাখা হয়। ভক্তরা এই শান্তিজল হৃদয়ে ধারণ করেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, আগামী বছর সেই শান্তিজল আবার ঘট ও প্রতিমার সঙ্গে যুক্ত করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
অন্যদিকে, রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যারতি শেষে মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন এবং মিষ্টিমুখ করেন।
এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় পূজামণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়।
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিভিন্ন মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয় এবং পাহারার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়। সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান সরকারি ছুটির আওতাভুক্ত ব্যক্তিরা।
দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এ উৎসব দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।