
বাংলাদেশে এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই স্তরগুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন। তবে একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র কারিগরি-ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসা এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়েছে।
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ৮৩ হাজার ৪৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ছিলেন ৬ লাখ ৯১ হাজার ২২৬ জন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে, ৮২ হাজার ৮৯টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯ জন। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১ হাজার ৩৭৩টি, শিক্ষক বেড়েছেন ২৪ হাজার ১২৭ জন; বিপরীতে শিক্ষার্থী কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী কমার চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৯ হাজার ২১১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। সে হিসাবে এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪টি, অথচ শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি।
শিক্ষার্থীর এই হ্রাসের নির্দিষ্ট কারণ ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, করোনা মহামারির পর তৈরি হওয়া শিখনঘাটতি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং সাম্প্রতিক নানা পরিস্থিতির কারণে কিছু শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে। শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিকেও শিক্ষার্থী কমার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার উদ্বেগের মধ্যে বাল্যবিবাহের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত ১ হাজার ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য অনুযায়ী, অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী। এই তথ্য মাধ্যমিক পর্যায়ে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের এই তথ্যকে দেশের সব শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সামগ্রিক চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। শিক্ষার্থী কমার পেছনে বাল্যবিবাহ কতটা দায়ী, তা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তৃত ও তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।
সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ২৬ হাজারের বেশি।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে। তবে শিক্ষার্থী কমার পেছনে আসনসংকট, শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা অন্যান্য কারণের মধ্যে কোনটি কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষা দেওয়া হয় এমন মাদ্রাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৯৬টি। ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি।
এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। তবে এই পরিসংখ্যানে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে দেশের সব ধরনের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসংখ্যার পূর্ণ চিত্র এই হিসাব থেকে পাওয়া যায় না।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীসংখ্যায় সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ছিল ১৪৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৬৭২ জন। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ এক বছরে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন।