
হামলার শিকার হওয়ার পর লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনটিতে হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করা হয় বলে জানিয়েছে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
পাইপলাইনে হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি। তবে সৌদি আরব ও ইরাক জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলার সঙ্গে জড়িত।
হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে দেশটির তেল রপ্তানিতে এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনো পরিষ্কার নয়।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের তীর পর্যন্ত তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। এর ফলে সৌদি আরবকে পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে ট্যাংকার পাঠানোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত। ফলে সৌদির জন্য বিকল্প তেল পরিবহনপথ হিসেবে এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের হিসাবে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। এই পরিমাণ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।
এদিকে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল–মানদেব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা।
ইয়েমেনের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, শুক্রবার প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম বা ময়উন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বৃহস্পতিবার দ্বীপটি থেকে সরে যাওয়ার পর সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌযান সেখানে পৌঁছায়। পরে দ্বীপটিতে যোদ্ধাদের মোতায়েন করা হয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাব আল–মানদেবের উপকূলজুড়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। তাঁরা সামরিক যানবাহনে এলাকায় চলাচল করছেন।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাব আল–মানদেবেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আরব উপদ্বীপের দুই পাশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথই এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার ঘটনাও সরবরাহ কমার অন্যতম কারণ বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা তারা চালিয়ে যাবে। গত সপ্তাহে বাব আল–মানদেব এলাকায় সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের সংঘর্ষে কয়েকশ মানুষ নিহত এবং হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। ইরান অবশ্য প্রকাশ্যে হুতিদের সামরিক নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজের জন্য সমুদ্রপথ নিরাপদ রয়েছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার ফোন করেছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয় বলে সৌদিকে জানিয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউস দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
সৌদি আরবের পাইপলাইনে হামলার পর ইরাকে একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বরখাস্ত হওয়া ওই কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন।
ইরানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাইসান দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে পরিচিত।
সৌদি আরবে হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরাক। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সৌদি আরবের অনুরোধও জানিয়েছে বাগদাদ। তবে এখনই পাল্টা হামলা চালানোর পথে যাচ্ছে না রিয়াদ।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
এদিকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করেছে ইরাক। নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি।
সৌদি পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করতে ইরাকে বড় পরিসরে অভিযান চলছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ ও বাব আল–মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদির বিকল্প তেল পরিবহনপথে হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নয়, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও জ্বালানির দামেও পড়তে পারে।