
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে নতুন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগের খবর সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিলে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন।
এই প্রস্তাবটি ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফরের সময় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর বৈঠক হয় ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে।
মার্কিন প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। প্রণালিটি অচল বা সীমিত হয়ে পড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে আরোপিত অর্থনৈতিক চাপ কমানোর পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।
এর আগে ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে একটি কঠোর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি ঘোষণা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আওতায় ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও জাহাজ পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতকে চাপে ফেলার লক্ষ্য নেওয়া হয়। ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা তৃতীয় দেশ বা প্রতিষ্ঠানকেও চাপের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে তেহরানের দাবিগুলো ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। পাশাপাশি সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে। গাজা ও লেবাননসহ অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতির দাবিও তেহরানের অবস্থানের অংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার মাধ্যমে সাময়িকভাবে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলায় সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
নতুন মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেননি। তবে মহসেন রেজাই আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তেহরানে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক পরিবর্তন করবে না।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব এবং তেহরানের বিস্তৃত দাবির মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় দ্রুত একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো এখনো কঠিন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।