
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে আয়োজিত ‘গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ না পায়। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের মতো চলে যাবে, কিন্তু দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ।’
জাতীয় সংসদে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করবে। বিরোধী দল বা অন্য কারও কোনো পরিকল্পনা থাকলে সেটিও জনগণের সামনে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিভ্রান্তিকর কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন না এবং জনগণের শান্তি নষ্ট করবেন না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি সময় আগে; এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই, এখন কাজ করার ও দেশ গড়ার সময়।’
জনগণের কল্যাণকে সরকারের প্রধান দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকা, মা-বোনদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ ও যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই প্রতিশ্রুত কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্প সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং আগামী ১৬ আগস্ট থেকে এর মূল কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এ সুবিধার আওতায় আসবে।
পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর কথাও জানান তিনি। সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণ চাষিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন। লবণ চাষিদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে শিগগিরই লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রামের মহেশখালী, মীরসরাই ও মাতারবাড়ী এলাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে থাকা ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ আরও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পাবেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ওই ব্যবস্থা জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠনে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে—সেই প্রস্তাবনা আমরা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব।’
তিনি বলেন, সরকার এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা ও বাসাবাড়িতে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায় এবং যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মানুষ সহজে গ্যাসের সুবিধা পায়।
চট্টগ্রাম থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা দুই মন্ত্রীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অঞ্চলের দুইজন ব্যক্তি যখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন, তখন চট্টগ্রামের উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন লক্ষ্য একটাই—জনগণের জীবনমান উন্নত করা এবং দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। জনগণের সমর্থন থাকলে সরকারের নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি শ্রমিকের হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে। যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে।’
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর বিভ্রান্ত হবে না এবং নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাঁশখালীর বাহারছড়া গ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারের জন্য নির্মিত নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন। পরে তিনি বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারা রোপণ করেন। একই সঙ্গে পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং হাঁস-মুরগি প্রদান করেন।