
আমরা এ বছর এমন এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বাংলাদেশের নারীরা দীর্ঘ কয়েক দশক পর আবারও ব্যাপক ও দৃশ্যমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে এক যুগান্তকারী ইতিহাস রচনা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন - গণঅভ্যুত্থানের প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে আমরা দেখেছি—ছাত্রী, তরুণী, শ্রমজীবী নারী, পেশাজীবী নারী, গৃহিণী ও মায়েরা সমাজের নানা স্তর থেকে এই আন্দোলনের ব্যাপকভাবে সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।তারা মিছিলে, বিক্ষোভে, শ্লোগানে, প্রতিবাদে রাজপথ মুখরিত রেখেছিল।
সমাজের নানা অংশের নারীদের এই অংশগ্রহণের পেছনে ছিল গভীর দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। একদিকে সন্তানদের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে একটি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই দুই প্রেরণাই অসংখ্য নারীকে রাজপথে নিয়ে এসেছে।
আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কারখানার শ্রমিক, শ্রমজীবী নারী এবং সাধারণ মানুষও ক্রমে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছেন। আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কেউ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন, কেউ পানীয় পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ নানাভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এগুলো ছিল আন্দোলনের অসাধারণ এক একটা মুহূর্ত।এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ জাগরণ - গণঅভ্যুত্থানে নারীরা এভাবে অংশগ্রহণ না করলে জুলাই অভ্যুত্থান সফল হতো কিনা সন্দেহ আছে।নারীর এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্থানে নারীবিদ্বেষী বিশেষ গোষ্ঠী আবার আতংকিত হয়ে পড়ে।
উত্তাল সেই দিনগুলোতে নারীদেরি স্বপ্ন ছিল—এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে; এমন একটি দায়বদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে উঠবে, যেখানে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে এবং নারীরাও সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারবে।
কিন্তু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ৮ আগস্ট অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর আমরা ভিন্ন এক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছি। ক্রমে দেখা গেল নতুন আয়োজনে রাজনীতির পুরনো কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলো। সরকারে কয়েকজন নারী উপদেষ্টা অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদের অধিকাংশেরই এই গণআন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত পছন্দে তারা এ সরকারে যুক্ত হন।অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যত গড়িয়েছে, ততই আমরা দেখেছি—যে বিশাল রাজনৈতিক আন্দোলন, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও গণঅভ্যুত্থানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই প্রক্রিয়া থেকেই তারা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
অভ্যুত্থানের পরপরই নারীদের চলাফেরা, পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার, বিদ্বেষ ও বুলিং চলেছে, তেমনি বাস্তব জীবনেও একা কোনো নারীকে দেখলেই তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, পোশাক নিয়ে আক্রমণাত্মক সমালোচনা এবং সামাজিক হয়রানির ঘটনা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কয়েক মাসজুড়েই আমরা এই উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করেছি।
এর ফলে নারীরা ক্রমশ নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থেকেছেন, কেউ শিক্ষাঙ্গনে, আবার কেউ ঘরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন। অথচ গণঅভ্যুত্থান এমন এক সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারতেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সম্ভাবনার অনেকটাই বাস্তবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা সমাজে এক ধরনের ধর্মীয় উগ্রবাদী ও জংগীবাদী শক্তির উত্থানও প্রত্যক্ষ করেছি। এই প্রবণতা যত শক্তিশালী হয়েছে, নারীর অধিকার তত সংকুচিত হয়েছে। নারীদের সামাজিক উপস্থিতি কমেছে, তাদের উচ্চকণ্ঠ হওয়ার পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং তাদেরকে আবারও নিতান্ত গৃহকেন্দ্রিক এক সংকীর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আরও একটি বড় বৈপরীত্য আমরা দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারকে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চরিত্রের সরকার হিসাবে আখ্যায়িত করা হলেও বাস্তবে তাদের দেড় বছরে সংঘটিত নারীবিদ্বেষী তৎপরতা, নারীর অধিকার, তাদের সম্মান ও মর্যাদার বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ অব্যাহত থাকলেও
এসবের বিরুদ্ধে তাদের কার্যকর কোনো প্রতিরোধ দেখতে পাওয়া যায়নি ; বরং তাদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে পুরো সময়জুড়েই নারীবিদ্বেষী উসকানিমূলক হিংসাত্মক নৈরাজ্যিক প্রবণতা ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।
এটি আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ ইতিহাসে আমরা ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেখেছি। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন—প্রতিটি গণআন্দোলনই আমাদের সমাজে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক পরিসরকে সম্প্রসারিত করেছে। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে খানিকটা বেরিয়ে এসে সমাজে আরও সক্রিয় ও স্বাধীন ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু ২০২৪-এর গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানকে আমরা তাৎপর্যবহ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করলেও, নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা দেখছি, নারীরা আগের তুলনায় আরও বেশি সংকুচিত হয়েছেন, নানাভাবে দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন; বিস্ময়করভাবেন রাষ্ট্র ও সমাজে তাদের অবস্থান দূর্বল হয়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক কমিশন গঠন করেছিল। নারী কমিশনও তার একটি। দীর্ঘ সময় পর নারী কমিশন তাদের প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রকাশ করলে একটি চিহ্নিত ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী কমিশন এবং এর সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যত জেহাদ ঘোষণার মতো অবস্থান গ্রহণ করে। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সরকারও তখন দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেনি; উদারনৈতিক মনোভাবের নাগরিক সমাজও পিছিয়ে যায়।প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহও নারী অধিকার বিরোধী এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা নিতে পারেনি।
ফলে নারী কমিশনের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ কার্যত ধামাচাপা পড়ে যায়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও নারী কমিশনের সুপারিশ আর আলোর মুখ দেখেনি, আলোচনায় আসেনি। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সমাজে নারী অধিকার, নারী মর্যাদা এবং নারীর সমঅধিকারের প্রশ্নে অনেক কথাবার্তা হলেও বাস্তবে দেশের নীতিনির্ধারকেরা নারীর অধিকার নিয়ে শক্ত অবস্থান নিতে এখনও প্রস্তুত নন।
প্রত্যাশা ছিল, সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অন্তত নারীদের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। বহু দশকের দাবি ছিল— জাতীয় সংসদে আলো সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করা এবং সেই আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন চালু করা।আমি নিজেও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে ঐকমত্য কমিশনের একাধিক বৈঠকে এই দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছি। কিন্তু আমাদের কণ্ঠ ও বক্তব্য খুব বেশি আমলে নেয়া হয়নি।
দুঃখজনকভাবে, নিজেদের গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক কিংবা প্রগতিশীল বলে দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার দেখা যায়নি। সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচনের প্রশ্নে তাদের দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা ছিল স্পষ্ট। আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই সরাসরি এ দাবির বিরোধিতা করে এসেছে।
ফলে যে ঐতিহাসিক সুযোগটি সৃষ্টি হয়েছিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও সেটিকে কাজে লাগাতে পারেনি।শেষ পর্যন্ত এক ধরনের আপসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলো—রাজনৈতিক দলগুলো ২০২৬ সালের নির্বাচনে ঐচ্ছিকভাবে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখলাম, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গড়ে মাত্র ৪ শতাংশ নারী মনোনয়ন পেয়েছেন।বিএনপিও তার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি নারী অধিকারের প্রশ্নে সবচেয়ে সোচ্চার বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলিও এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামি দলগুলো কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।
যে তরুণেরা অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে ছিল, দল গঠনের পর যাদের সাথে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণী যুক্ত হয়েছিলেন, সেই দল যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত তৈরি করল, তখন এর প্রতিবাদে এনসিপির অনেক নারীনেত্রী ও সংগঠক দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে নির্বাচনেও দেখা গেল, এনসিপির নারী প্রার্থীরা কার্যকর রাজনৈতিক সমর্থন পাননি।
গোটা অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে আমরা দেখি, যে বিশাল গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থান সমাজে নারীর অধিকারসহ যেসব নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, বাস্তবে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নটি ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে।২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। প্রত্যক্ষ নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী বিজয়ী হয়েছেন।
পরবর্তীকালে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে পুরানো ধারায়, একসময় যেটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করা হতো। বিএনপি ৩৬টি এবং জামায়াত-এনসিপি মিলে বাকি ১৪টি সংরক্ষিত আসন পেয়েছে। এর ফলে সংসদে নারীর সংখ্যাগত উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে বটে, কিন্তু বাস্তব অর্থে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। এত দীর্ঘ আন্দোলন, এত ত্যাগ, এমনকি নারীদের আত্মদান সত্ত্বেও সাংবিধানিকভাবে এবারও নারীর রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। হতাশা এখানে যে, বিরাট এক সম্ভাবনা জাগিয়েও আমরা সামনে এগোতে পারিনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও পিছিয়েছি।
রাজনৈতিক দলগুলো জনসভা-সমাবেশে নারী অধিকারের কথা বলে আসছে। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা, নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদান কিংবা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বাস্তব প্রশ্নে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন আমরা দেখিনি। ফলে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিল—একটি অধিকতর সমতাভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ নির্মাণের—নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে আমরা বাস্তবে খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারিনি।
বরং গত দুই বছরে আমরা দেখেছি, নারীর বিরুদ্ধে আক্রমণ বেড়েছে। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়নসহ নারীর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর নিরাপত্তা আজ আরও অনিশ্চিত—ঘরে, কর্মস্থলে, শিক্ষাঙ্গনে, সর্বত্র। ফলে এত বড় গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পরও নারীর অধিকার ও মুক্তির লড়াই যেন আবারও সেই পুরোনো জায়গাতেই ফিরে এসেছে।
নারীর অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্নে দুটো মৌলিক সমস্যা রয়েছে।
প্রথমত, আমাদের সমাজে নারীরা এখনও গভীর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির শিকার। এত বড় গণঅভ্যুত্থানও সেই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ও মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, শ্রেণীশোষণের প্রশ্ন। একজন নারী যদি দরিদ্র, শ্রমজীবী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশ হন, তাহলে তিনি দ্বিগুণভাবে বঞ্চনার শিকার হন। আমরা লক্ষ্য করেছি, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও নারী নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সমাজের দরিদ্র, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক পরিবারের নারী ও শিশুরাই।
এর মধ্যে সম্প্রতি আমরা আশা জাগানো একটি ঘটনা দেখেছি—রামিসার বর্বরোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাও আমরা লক্ষ্য করেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে শত শত নারী ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাঁদের প্রতিটি মামলাও কি একই গুরুত্ব ও একই গতিতে এগোচ্ছে? গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা আমাদের সে আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে পারছেনা।
ফলে নারীর জন্য ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনও অনেকটাই আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। এই লড়াই নারীদের নিজেদেরই এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি সমাজের সচেতন পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতান্ত্রিক মানুষ যদি এই সংগ্রামে আন্তরিকভাবে পাশে না দাঁড়ান, তাহলে আমরা কোনোভাবেই নিজেদের আধুনিক, সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবেও দাবি করতে পারব না।
২০২৪ এর অভূতপূর্ব গণজাগরণ - গণঅভ্যুত্থান নারীশক্তির যে অসাধারণ সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল তা দেশের নারীদের অধিকার আর মর্যাদার প্রশ্নে গভীর এক আত্মবিশ্বাস,সাহস ও ভরসা সৃষ্টি করেছিল। জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী চেতনা এগিয়ে নিতে, তাকে বাস্তবায়িত করতে এই সাহস আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করতে হবে, তাকে ধারণ করতে হবে।তাহলে জুলাইয়ের আত্মাকে ধারন ও জুলাইয়ের বীর শহীদদের প্রতি আমরা প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে পারব।
বহ্নিশিখা জামালী
রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
সম্পাদক, কালের দাবি